বিয়ে বা নতুন সংসার শুরু করা জীবনের অন্যতম সুন্দর একটি অধ্যায়। একটি ফাঁকা ঘরকে নিজেদের মনের মতো করে সাজিয়ে তোলার আনন্দই আলাদা। আর এই ঘর সাজানোর অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হলো মানসম্মত ইলেকট্রনিক্স ও হোম অ্যাপ্লায়েন্স। নতুন সংসার সাজানোর সময় সঠিক হোম অ্যাপ্লায়েন্স নির্বাচন করা শুধু আরাম বা বিলাসের বিষয় নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক বিনিয়োগ।
নতুন সংসার সাজানোর শুরুতে কেনাকাটার বাজেট এমনিতেই একটু আঁটসাঁট থাকে। এসময় অনেকেই না বুঝে কেবল দেখতে সুন্দর বা সস্তা দামের লোভে ভুল ব্র্যান্ড বা ভুল স্পেসিফিকেশনের হোম অ্যাপ্লায়েন্স (Home Appliances) কিনে ফেলেন। এর ফলে মাস শেষে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের (Electricity bill) বোঝা টানতে হয়, অথবা কিছুদিন পরেই দামি ইলেকট্রনিক্স পণ্যটি নষ্ট হয়ে যায়।
তাই হুট করে কোনো পণ্য কেনার আগে একটি সঠিক গাইডলাইন বা বায়িং গাইড (Buying Guide) জানা অত্যন্ত জরুরি। আপনার পরিবারের সদস্য সংখ্যা, দৈনন্দিন ব্যবহারের ধরন এবং বাজেটের ওপর ভিত্তি করে সঠিক পণ্যটি আগে থেকেই পরিকল্পনা করা উচিত।
নতুন সংসারে হোম অ্যাপ্লায়েন্স বাছাইয়ের বিশেষজ্ঞ গাইডলাইন
যেকোনো হোম অ্যাপ্লায়েন্স একটি বেশ বড় বাজেটের কেনাকাটা। তাই দোকানে যাওয়ার আগে কিছু প্রযুক্তিগত এবং ব্যবহারিক বিষয়ে ধারণা থাকা আপনার আর্থিক সাশ্রয় ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। চলুন জেনে নিই সেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো:
বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও ইনভার্টার প্রযুক্তি
বর্তমানে যেকোনো বড় অ্যাপ্লায়েন্স (যেমন: ফ্রিজ বা এসি) কেনার সময় সবচেয়ে বেশি যে শব্দটি শোনা যায়, তা হলো 'ইনভার্টার'। ইনভার্টার নন-ইনভার্টার কম্প্রেসর গুলোর মধ্যে কিছু পার্থক্য আছে। সাধারণ বা নন-ইনভার্টার কম্প্রেসরগুলো একটি নির্দিষ্ট গতিতে চলে। ঘরের তাপমাত্রা ঠিক রাখতে এগুলো বারবার ফুল স্পিডে চালু হয় এবং বন্ধ হয়, যা প্রচুর বিদ্যুৎ টানে। অন্যদিকে, ইনভার্টার প্রযুক্তির মোটর প্রয়োজন অনুযায়ী নিজের স্পিড কমিয়ে বা বাড়িয়ে নিতে পারে। এটি বারবার বন্ধ বা চালু হয় না। ফলে ইনভার্টার পণ্য কিনতে শুরুতে কিছুটা বেশি টাকা লাগলেও, দীর্ঘমেয়াদে এটি আপনার ৩০-৫০% পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিল বাঁচায়, যা কয়েক বছরের মধ্যেই আপনার বাড়তি বিনিয়োগের টাকাটা উঠিয়ে আনে।
ভোল্টেজ ওঠানামা
আমাদের দেশের বাসাবাড়িতে, বিশেষ করে গরমকালে ভোল্টেজ আপ-ডাউনের সমস্যা খুবই সাধারণ একটি ঘটনা। হঠাৎ ভোল্টেজ কমে গেলে বা বেড়ে গেলে দামি অ্যাপ্লায়েন্সের মাদারবোর্ড বা কম্প্রেসর পুড়ে যেতে পারে। এই সমস্যা থেকে বাঁচতে এমন পণ্য নির্বাচন করুন যেগুলোতে 'ওয়াইড ভোল্টেজ রেঞ্জ' (Wide Voltage Range) বা স্ট্যাবিলাইজার-ফ্রি অপারেশন সুবিধা রয়েছে। এর ফলে আপনার আর আলাদা করে ভোল্টেজ স্ট্যাবিলাইজার কেনার প্রয়োজন হবে না এবং পণ্যটিও সুরক্ষিত থাকবে।
বিক্রয়োত্তর সেবা ও ওয়ারেন্টি
ইলেকট্রনিক্স পণ্য ব্যবহারের সময় বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই কেনার সময় শুধু পণ্যের দাম বা ডিজাইন দেখলে হবে না, বরং আপনার বাড়ির আশেপাশে ওই ব্র্যান্ডের লোকাল সার্ভিস সেন্টার আছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। ওয়ালটন, সিঙ্গার, ভিশন বা স্যামসাং-এর মতো ব্র্যান্ডগুলোর সারা দেশেই শক্তিশালী সার্ভিস নেটওয়ার্ক রয়েছে। ওয়ারেন্টি পলিসি কত দিনের এবং পার্টস সহজে পাওয়া যায় কি না, এই বিষয়গুলো জেনে নিলে ভবিষ্যতে বিপদে পড়তে হবে না।
১. রেফ্রিজারেটর বা ফ্রিজ: সঠিক সাইজ ও প্রযুক্তি নির্বাচন
নতুন সংসারের জন্য সবচেয়ে প্রথম এবং অপরিহার্য অ্যাপ্লায়েন্স হলো একটি রেফ্রিজারেটর বা ফ্রিজ। কাঁচাবাজার সংরক্ষণ থেকে শুরু করে বেঁচে যাওয়া খাবার ভালো রাখা ফ্রিজ ছাড়া আধুনিক জীবন কল্পনা করাও কঠিন।
পরিবারের সদস্য সংখ্যা বনাম প্রয়োজনীয় ফ্রিজের ক্যাপাসিটি (টেবিল):
|
পরিবারের সদস্য সংখ্যা
|
ফ্রিজের আদর্শ ধারণক্ষমতা (লিটার)
|
ব্যবহারের ধরন
|
|
১-২ জন (নতুন দম্পতি)
|
১৫০ – ২০০ লিটার
|
বেসিক রান্নাবান্না, অল্প কাঁচাবাজার
|
|
২-৩ জন (ছোট পরিবার)
|
২০০ – ৩০০ লিটার
|
সাপ্তাহিক বাজার, নিয়মিত রান্না
|
|
৪-৫ জন (মাঝারি পরিবার)
|
৩০০ – ৪০০ লিটার
|
বেশি পরিমাণ মাছ-মাংস ও সবজি সংরক্ষণ
|
|
৫ জনের বেশি
|
৪০০+ লিটার
|
বড় পরিবারের মাসিক বাজারের জন্য
|
ডিরেক্ট কুল বনাম নো-ফ্রস্ট
ফ্রিজ সাধারণত দুই ধরনের হয়। 'ডিরেক্ট কুল' (Direct Cool) ফ্রিজে সাধারণ নিয়মে বরফ জমে। বাংলাদেশে সাধারণ ব্যবহারের জন্য এটি খুবই জনপ্রিয়, কারণ বিদ্যুৎ চলে গেলেও এই ফ্রিজগুলো দীর্ঘক্ষণ খাবার ঠান্ডা রাখতে পারে। অন্যদিকে 'নো-ফ্রস্ট' (No-Frost) ফ্রিজের ভেতরে কোনো দৃশ্যমান বরফ জমে না। ফলে বারবার বরফ গলিয়ে ফ্রিজ পরিষ্কার করার ঝামেলা থাকে না। তবে বিদ্যুৎ চলে গেলে নো-ফ্রস্ট ফ্রিজে তুলনামূলক দ্রুত ঠান্ডা ভাব কমে যায়। আধুনিক শহরের ফ্ল্যাট বাড়ির জন্য নো-ফ্রস্ট বেশ সুবিধাজনক।
ধারণক্ষমতা ও বাজেট
নতুন ফ্রিজ কেনার আগে বাজেট এবং এর ধারণক্ষমতা বা ক্যাপাসিটি (Capacity) সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখা অত্যন্ত জরুরি। পরিবারের সদস্য সংখ্যা না বুঝে ফ্রিজ কিনলে পরবর্তীতে আপনাকে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে।
সঠিক সাইজের ফ্রিজ নির্বাচন:
প্রয়োজনের চেয়ে বড় ফ্রিজ কেনার ক্ষতিকর দিক: ভবিষ্যতের কথা ভেবে অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত বড় সাইজের ফ্রিজ কিনে থাকেন।
এর প্রধান কারণগুলো হলো:
-
বাজেট নষ্ট: বড় ফ্রিজ কিনতে প্রাথমিকভাবে অনেক বেশি টাকা বিনিয়োগ করতে হয়।
-
অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল (High Electricity Bill): ফ্রিজ বড় হলে এর ভেতরের অতিরিক্ত ফাঁকা জায়গা ঠান্ডা রাখতে কম্প্রেসরকে (Compressor) অনেক বেশি কাজ করতে হয়। ফলে মাস শেষে আপনার বিদ্যুৎ বিল স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি আসবে।
বাংলাদেশের বাজারের সেরা ব্র্যান্ড ও তুলনামূলক চিত্র
দেশীয় বাজারে সাশ্রয়ী দামে সেরা ফিচার এবং মানসম্মত ফ্রিজ (Refrigerator) কিনতে চাইলে আপনার প্রয়োজন ও বাজেটের ওপর ভিত্তি করে সঠিক ব্র্যান্ডটি বেছে নেওয়া জরুরি।
-
ওয়ালটন (Walton) ও ভিশন (Vision): বাজেটের মধ্যে সর্বোচ্চ ফিচার দিতে এই দুটি ব্র্যান্ড দারুণ জনপ্রিয়। বাংলাদেশের আবহাওয়া ও তাপমাত্রার কথা মাথায় রেখে এরা ফ্রিজ তৈরি করে।
-
সিঙ্গার (Singer): সহজ কিস্তিতে (EMI) পণ্য কেনা এবং নির্ভরযোগ্য আফটার সেলস সার্ভিসের জন্য সিঙ্গার ক্রেতাদের কাছে অত্যন্ত বিশ্বস্ত একটি নাম।
-
কিয়াম (Kiam): সাশ্রয়ী মূল্যে টেকসই ডিজাইন এবং দীর্ঘস্থায়ী পারফরম্যান্সের কারণে কিয়াম সম্প্রতি ইলেকট্রনিক্স বাজারে বেশ ভালো সাড়া ফেলছে।
-
এলজি (LG) ও স্যামসাং (Samsung): বাজেট যদি একটু বেশি থাকে এবং আধুনিক প্রযুক্তি, স্মার্ট ফিচার ও প্রিমিয়াম ফিনিশিং চান, তবে এলজি বা স্যামসাং হতে পারে আপনার সেরা পছন্দ।
সঠিক ব্র্যান্ড নির্বাচনের ক্ষেত্রে আপনার নির্দিষ্ট বাজেট, কিস্তি সুবিধা এবং বাড়ির আশেপাশের সার্ভিস সেন্টারের অবস্থান বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিন।
২. ওয়াশিং মেশিন: দৈনন্দিন কাজের চাপ কমানোর আধুনিক সমাধান
অফিস ও সংসারের হাজারো ব্যস্ততার পর প্রতিদিন এক গাদা ময়লা কাপড় হাতে ধোয়া অত্যন্ত কষ্টকর ও সময়সাপেক্ষ। কর্মব্যস্ত জীবনে কাপড় কাচার এই ঝামেলা এড়াতে একটি আধুনিক ওয়াশিং মেশিন (Washing Machine) হতে পারে আপনার সেরা সমাধান। ওয়াশিং মেশিন এখন আর কোনো বিলাসী পণ্য নয়, বরং এটি আপনার দৈনন্দিন কাজের চাপ কমিয়ে আপনাকে নিজের জন্য কিছুটা সময় বের করে দেয়। পাশাপাশি, বর্তমানে বাজারে থাকা আধুনিক মানের ওয়াশিং মেশিন গুলো কাপড়ের বুনন ও রং সুরক্ষিত রেখে একদম নিখুঁত পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করে।"
টপ লোড বনাম ফ্রন্ট লোড
ওয়াশিং মেশিন মূলত দুই রকম: টপ লোড ওয়াশিং মেশিন(ওপর দিয়ে কাপড় দিতে হয়) এবং ফ্রন্ট লোড ওয়াশিং মেশিন (সামনে দিয়ে কাপড় দিতে হয়)। টপ লোড মেশিনের দাম তুলনামূলক কম থাকে। তবে এতে পানি ও ডিটারজেন্ট কিছুটা বেশি লাগে। অন্যদিকে, ফ্রন্ট লোড মেশিনগুলো দামে একটু বেশি হলেও এগুলো কাপড় খুব যত্ন সহকারে পরিষ্কার করে, ওয়াশিং কোয়ালিটি অনেক ভালো হয় এবং পানি ও বিদ্যুৎ দুটোই বেশ সাশ্রয় করে। দীর্ঘমেয়াদী চিন্তায় ফ্রন্ট লোড একটি চমৎকার বিনিয়োগ।
ক্যাপাসিটি ও পানির চাপ ফ্যাক্ট
নতুন সংসারের ২-৩ জন মানুষের জন্য ৭ থেকে ৮ কেজি ধারণক্ষমতার ওয়াশিং মেশিন একেবারেই পারফেক্ট। এতে আপনি চাইলে বেডশিট বা ভারী পাতলা কম্বলও ধুতে পারবেন। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ওয়াশিং মেশিন কেনার আগে একটি বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি পানির চাপ বা ওয়াটার প্রেশার। ফুল অটোমেটিক মেশিনে পানির একটি নির্দিষ্ট প্রেশার লাগে। আপনার ফ্ল্যাট যদি একেবারে টপ ফ্লোরে হয় এবং পানির প্রেশার খুব কম থাকে, তবে মেশিন ঠিকমতো কাজ নাও করতে পারে। সেক্ষেত্রে এমন মেশিন কিনুন যা 'লো ওয়াটার প্রেশার'-এ কাজ করতে পারে, অথবা আলাদা প্রেশার পাম্প লাগানোর ব্যবস্থা রাখুন।
৩. হেভি-ডিউটি ব্লেন্ডার ও মিক্সার গ্রাইন্ডার: মসলা বাটা ও কিচেন লাইফলাইন
বাঙালি রান্না মানেই নানা রকম মসলার ব্যবহার। আর এই মসলা বাটার ঝামেলা থেকে বাঁচতে কিচেনে একটি ভালো মানের ব্লেন্ডার বা মিক্সার গ্রাইন্ডার থাকা বাধ্যতামূলক। সাধারণ জুস বানানোর ব্লেন্ডার দিয়ে শক্ত মসলা বাটা যায় না, তাই কিচেনের কাজের জন্য একটি হেভি-ডিউটি ব্লেন্ডার ও মিক্সার গ্রাইন্ডার কেনাই বুদ্ধিমানের কাজ।
মোটর ওয়াটেজ ও আরপিএম (RPM)
দেশীয় রান্নায় হলুদ, জিরা, ধনে বা শুকনা মরিচের মতো শক্ত মসলা গুঁড়া করা একটি নিত্যদিনের কাজ। এই ভারী কাজের জন্য একটি শক্তিশালী মোটরযুক্ত গ্রাইন্ডার বা ব্লেন্ডার (Blender/Grinder) নির্বাচন করা অত্যন্ত জরুরি।
সঠিক ব্লেন্ডার নির্বাচনের ক্ষেত্রে নিচের বিষয়গুলো খেয়াল রাখুন:
-
সঠিক ওয়াট (Watt) নির্বাচন: শক্ত মসলা নিখুঁতভাবে গুঁড়া করার জন্য অন্তত ৭৫০ ওয়াট (750W) ক্ষমতার মোটর আছে এমন ব্লেন্ডার কেনা উচিত।
-
কম ওয়াটের ঝুঁকি: ৭৫০ ওয়াটের চেয়ে কম ক্ষমতার মেশিনে শক্ত মসলা ব্লেন্ড করলে মোটরের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। এর ফলে মোটর অতিরিক্ত গরম হয়ে পুড়ে যাওয়া কিংবা পোড়া তারের গন্ধ বের হওয়ার প্রবল ঝুঁকি থাকে, যা মেশিনের আয়ু কমিয়ে দেয়।
-
আরপিএম (RPM) বা ঘূর্ণন গতি: কেনার সময় ব্লেন্ডারের মোটরের RPM (Revolutions Per Minute) চেক করে নিন। মোটরের ঘূর্ণন গতি বা RPM যত বেশি হবে, আপনার মসলা তত দ্রুত মিহি ও মসৃণ হবে।
দীর্ঘদিন ঝামেলাবিহীন সাপোর্ট পেতে এবং ব্লেন্ডারের মোটর সুরক্ষিত রাখতে সব সময় ৭৫০ ওয়াট বা তার বেশি ক্ষমতার কপার মোটরের (Copper Motor) ব্লেন্ডার বেছে নিন।
ওভারলোড প্রটেকশন ও জারের উপাদান
ব্লেন্ডার কেনার সময় অবশ্যই খেয়াল রাখবেন তাতে 'ওভারলোড প্রটেক্টর' সুইচ আছে কি না। অনেক সময় জারে অতিরিক্ত মসলা দিলে বা মোটর বেশি গরম হয়ে গেলে এই সুইচটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে মেশিনের লাইন বন্ধ করে দেয়, ফলে মোটর পুড়ে যাওয়া থেকে বেঁচে যায়। এছাড়া ব্লেন্ডারের জারগুলো স্টেইনলেস স্টিলের (Stainless Steel) হওয়া উচিত। প্লাস্টিকের জার দ্রুত ফেটে যায় এবং মসলার দাগ বসে যায়, কিন্তু স্টিলের জার বছরের পর বছর নতুনের মতো টেকসই ও স্বাস্থ্যসম্মত থাকে।
৪. মাইক্রোওয়েভ ওভেন: খাবার গরম ও দ্রুত রান্নার ভরসা
সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে ফ্রিজ থেকে বের করে ঠান্ডা খাবার চুলায় গরম করা বেশ বিরক্তিকর। একটি মাইক্রোওয়েভ ওভেন আপনার এই কাজটিকে মাত্র কয়েক মিনিটের সহজ একটি কাজে পরিণত করতে পারে। আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী সাশ্রয়ী মূল্যে সেরা মাইক্রোওয়েভ ওভেন নির্বাচন করা উচিত।
আপনার জন্য কোন ওভেনটি সঠিক?
ধারণক্ষমতা
নতুন পরিবারের দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য ২০ থেকে ২৫ লিটারের মাইক্রোওয়েভ ওভেন একেবারেই আদর্শ। এর চেয়ে ছোট ওভেনে বড় বাটি বা প্লেট ঢোকাতে সমস্যা হতে পারে, আর এর চেয়ে বড় ওভেন শুধু শুধু রান্নাঘরের জায়গা নষ্ট করবে।
৫. স্মার্ট টিভি: আধুনিক বিনোদনের কেন্দ্রবিন্দু
একটি ভালো মানের স্মার্ট সিস্টেম টিভি বসার ঘর বা বেডরুমের প্রাণ। বর্তমানে স্মার্ট টিভির দাম অনেকটাই হাতের নাগালে ।
সাইজ ও ডিসপ্লে রেজোলিউশন
টিভি কেনার সময় ঘরের সাইজ বিবেচনা করা সবচেয়ে জরুরি। আপনার বেডরুম বা ছোট ড্রয়িংরুমের জন্য ৩২ ইঞ্চি থেকে ৪৩ ইঞ্চি টিভিই যথেষ্ট। খুব ছোট ঘরে বড় টিভি লাগালে চোখের ক্ষতি হতে পারে। ৩২ ইঞ্চি টিভির ক্ষেত্রে বাজেট-বান্ধব এইচডি (HD) টিভি এবং, ৪৩ ইঞ্চি বা তার বড় টিভি কিনলে অবশ্যই স্পষ্ট ভিজ্যুয়ালের জন্য ফুল এইচডি (FHD) টিভি রেজোলিউশনের টিভি কিনবেন, যাতে ছবি একদম ঝকঝকে দেখায়।
স্মার্ট ওএস (OS) ও প্যানেল ওয়ারেন্টি
টিভি কেনার সময় অফিসিয়াল অ্যান্ড্রয়েড টিভি (Android TV) বা গুগল টিভি (Google TV) ইন্টারফেস যুক্ত টিভি নির্বাচন করুন। এতে আপনি ইউটিউব, নেটফ্লিক্স, হইচই-এর মতো সব অ্যাপ খুব মসৃণভাবে চালাতে পারবেন। এছাড়া, টিভির সবচেয়ে দামি অংশ হলো এর স্ক্রিন বা প্যানেল। তাই কেনার সময় অবশ্যই জেনে নেবেন যে ব্র্যান্ড প্যানেল রিপ্লেসমেন্ট গ্যারান্টি (Panel Replacement Guarantee) কত বছরের দিচ্ছে। প্যানেলের ওয়ারেন্টি যত বেশি, আপনার বিনিয়োগ তত নিরাপদ।
হোম অ্যাপ্লায়েন্স কেনার সময় সাধারণ ভুল এড়ানোর উপায়
নতুন ইলেকট্রনিক্স পণ্য বা অ্যাপ্লায়েন্স কেনার সময় ক্রেতারা প্রায়ই কিছু সাধারণ ভুল করে থাকেন, যা পরবর্তীতে বড় ধরনের আর্থিক ও শারীরিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। এই ঝুঁকিগুলো এড়াতে নিচের বিষয়গুলো অবশ্যই খেয়াল রাখুন:
১. আনঅফিসিয়াল বা গ্রে-মার্কেট পণ্য পরিহার: কিছুটা কম দামের লোভে অনেকেই আনঅফিসিয়াল বা গ্রে-মার্কেটের (Grey Market) পণ্য কেনেন। মনে রাখবেন, এসব পণ্যের কোনো অফিসিয়াল ওয়ারেন্টি (Official Warranty) থাকে না। ফলে হঠাৎ মেশিন নষ্ট হলে মেরামতের পেছনে আপনার অনেক টাকা নষ্ট হতে পারে। তাই নির্ভরযোগ্য ও দীর্ঘস্থায়ী সার্ভিসের জন্য সবসময় অথোরাইজড শোরুম থেকে পণ্য কিনুন।
২. সঠিক আর্থিং (Earthing) নিশ্চিত করা: বাংলাদেশের অনেক বাসাতেই সঠিক আর্থিং ব্যবস্থা থাকে না। ফ্রিজ বা ওয়াশিং মেশিনের মতো মেটাল বডির অ্যাপ্লায়েন্স ব্যবহার করার আগে অভিজ্ঞ ইলেকট্রিশিয়ান দিয়ে বাসার প্লাগ পয়েন্টগুলোতে সঠিক আর্থিং আছে কি না, তা চেক করিয়ে নিন। নইলে বডি শর্ট হয়ে মারাত্মক বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা (Electric Shock) ঘটতে পারে কিংবা মেশিনের দামি মাদারবোর্ড পুড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
৩. প্রয়োজনের চেয়ে বড় সাইজ এড়িয়ে চলা: অন্যের দেখা-দেখি বিশাল সাইজের ফ্রিজ বা ওয়াশিং মেশিন কেনার প্রবণতা থেকে বের হয়ে আসুন। আপনার পরিবারের প্রকৃত প্রয়োজনের চেয়ে বড় সাইজের অ্যাপ্লায়েন্স কিনলে শুধু কেনার খরচই বাড়ে না, বরং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল (High Electricity Bill) আসে এবং ঘরের অনেকটা মূল্যবান জায়গাও নষ্ট হয়।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও বিশেষজ্ঞের শেষ পরামর্শ
নতুন সংসার সাজানোর সময় আবেগ নয়, বরং বাস্তবতাকে প্রাধান্য দিয়ে পরিবারের আসল প্রয়োজন অনুযায়ী শুরুতেই একটি নির্দিষ্ট বাজেট তৈরি করুন এবং সেই বাজেটের মধ্যেই সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসগুলোকে অগ্রাধিকার দিন।
মনে রাখবেন, যেকোনো হোম অ্যাপ্লায়েন্স বা ইলেকট্রনিক্স পণ্য কেনার আগে শুধু এর বাইরের সৌন্দর্য বা সস্তা দাম না দেখে, ওই নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের আফটার সেলস সার্ভিস এবং ওয়ারেন্টি পলিসি সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে তবেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া আপনার জন্য সবচেয়ে লাভজনক ও নিরাপদ হবে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী
প্রশ্ন ১: নতুন সংসারের জন্য ইনভার্টার ফ্রিজ কেনা কি আসলেই জরুরি?
হ্যাঁ, ইনভার্টার ফ্রিজ সাধারণ ফ্রিজের তুলনায় প্রায় ৩০-৫০% বিদ্যুৎ সাশ্রয় করে। যেহেতু ফ্রিজ সারাদিন ২৪ ঘণ্টা চলতে থাকে, তাই দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ বিল কমানোর জন্য ইনভার্টার প্রযুক্তি সম্পন্ন ফ্রিজ কেনা খুবই বুদ্ধিমানের কাজ।
প্রশ্ন ২: ওয়াশিং মেশিনে কি বিদ্যুৎ বিল অনেক বেশি আসে?
না, আধুনিক ওয়াশিং মেশিনের মোটর খুব কম বিদ্যুৎ খরচ করে। তবে আপনি যদি কাপড় ধোয়ার সময় 'হট ওয়াটার' বা গরম পানির অপশন ব্যবহার করেন, তবে পানি গরম করার হিটারের জন্য কিছুটা বিদ্যুৎ বিল বেশি আসতে পারে। নরমাল পানিতে ধুলে বিদ্যুৎ খরচ খুবই সামান্য।
প্রশ্ন ৩: বাংলাদেশের বাজারে সাশ্রয়ী দামে সেরা হোম অ্যাপ্লায়েন্স ব্র্যান্ড কোনটি?
সাশ্রয়ী দাম এবং চমৎকার স্পেসিফিকেশনের দিক থেকে ওয়ালটন (Walton) এবং ভিশন (Vision) দেশের বাজারে অন্যতম সেরা। পাশাপাশি সিঙ্গার (Singer) কিস্তি সুবিধা এবং দেশব্যাপী সহজ লভ্য আফটার সেলস সার্ভিসের কারণে দারুণ জনপ্রিয়।